উচ্চারণের নিয়ম
শব্দ যদি অক্ষরে (স্বরাক্ষর ও হসাক্ষর) ভাগ করে উচ্চারণ করা হয় তাহলে উচ্চারণ ও বানান দুটিই সহজ হয়ে যায়। যেমন: সুন্দর— সুন+দোর। এখানে দোর হবে কারণ যুক্তবর্ণ বিশ্লেষণ করলে পরের বর্ণের সঙ্গে ও-কার যুক্ত হয়। বানানো শব্দের উচ্চারণ কিন্তু অনেক সময় শব্দের ওপর নির্ভর করে না। আবার এমন কিছু সংস্কৃত শব্দ আছে যার লিখিত রূপ আর উচ্চারিত রূপ এক নয়। লেখি ‘অণু’ কিন্তু উচ্চারণ করি ‘ওনু’। লেখি ‘স্বাধীন’ কিন্তু উচ্চারণ করি ‘শাধিন’ আর সংস্কৃতে উচ্চারিত হয় ‘সুয়াধিন’ লেখি ‘নদী’ কিন্তু উচ্চারণ করি ‘নোদি’। লেখি ‘সহ্য’ আর উচ্চারণ করি ‘সোজঝো’। লেখি ‘সমাস’ কিন্তু উচ্চারণ করি ‘শমাশ’। লেখি ‘শ্রমিক’ কিন্তু উচ্চারণ করি ‘স্রোমিক’। কেনো এমন হয়, এসব জানতেই আমাদের উচ্চারণের নিয়ম শিখতে হয়।
১. শব্দের প্রথমে ‘অ’ দিয়ে গঠিত শব্দটি যদি নাবোধক হয় তাহলে অ-এর উচ্চারণ হবে ‘অ’ এর মতো। যেমন: অমর, অটল, অনাচার, অপকারী, অকথা, অকাজ, অবোধ ইত্যাদি।
২. শব্দের প্রথমে ‘অ’ দিয়ে গঠিত শব্দটি যদি নাবোধক না হয় যদি অন্য অর্থবোধক শব্দ হয় তাহলে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: অমর (ওমর,নাম), অধীন (ওধীন), মন (মোন) ইত্যাদি।
৩. শব্দের প্রথমে ‘অ’ এবং এর পরে যদি ‘আ’ থাকে তাহলে অ-এর উচ্চারণ হবে ‘অ’ এর মতো। যেমন: অনাচার, অমানিশা, কথা।
৪. সম্বোধনসূচক শব্দ ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন : ও/অ ভাই, ও/অ কপাল।
৫. বিদেশি শব্দে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: অক্ত-ওক্ত, অজু-ওজু।
৬. ‘এ’ কখনো ‘এ’ আবার কখনো ‘এ্যা’ উচ্চারিত হয়। যেমন: ‘এ’ : দেশ, বেশ, এসো, এলো। ‘এ্যা’ : দেখা, বেচা, ফেলা, হেলা, ঠেলা ইত্যাদি। কিন্তু এ-কারের পরে যদি ই/উ/এ/ও-কার থাকলে ‘এ’ উচ্চারিত হয়। যেমন: একি, দেখি, বেশি, মেঠো।
৭. ‘এক’ শব্দ ‘এ্যা’ উচ্চারিত হয়। যেমন: এক। আবার তিন বর্ণ বিশিষ্ট শব্দে ‘এ’ উচ্চারিত হয়। যেমন : একাল, একতা, একান্ত, যেমন, এমন, কেমন, মেলা, এসিড।
৮. দৃশ্যগত ‘অ্যা’ উচ্চারিত শব্দ। যেমন : ব্যাং, ব্যাঙ, খ্যাপা, ব্যাখ্যা।
৯. ‘এ্য’ থাকলেও ‘এ’ উচ্চারিত হয়। যেমন: ব্যক্তি (বেক্তি), ব্যতিক্রম (বেতিক্রম), ব্যতিহার, ব্যতীত, ব্যভিচার।
১০. ‘এ্যা’ উচ্চারিত হবে না। যেমন: এবং, একুশ, এমনি।
১১. দ্বিস্বর বা যৌগিকবর্ণ ‘ওই’ উচ্চারিত হয়। যেমন : ঐক্য (ওইককো), ঐতিহ্য (ওইতিজঝো), কৈ (কোই), দৈ (দোই) ইত্যাদি।
১২. অনেক সকয় ‘ঐ’ ভেঙে ‘ওই’ উচ্চারিত হয়। যেমন : ওইখানে যাও।
১৩. ই/ঈ/এ-যুক্ত বর্ণের পরের বর্ণে যদি ‘য়’ থাকে তাহলে ‘অ’ সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: প্রিয়, স্বীয়, দেয়, স্মরণীয়, বরণীয়, তুলনীয়। কিন্তু স্বরকার যুক্ত থাকলে ‘অয়’ উচ্চারিত হয়। যেমন: খায়, বায়, নায়, পায়, মায়, গায়, যায়।
১৪. প্রথম বর্ণের সাথে ঋ, ঐ, ঔ যুক্ত হলে পরের ‘অ’ প্রায়ই ‘অ’ এর মতো উচ্চারিত হয়। যেমন: তৃণ, ধৈর্য, মৌন ইত্যাদি।
১৫. হসচিহ্ন নাই তবে হসোচ্চারিত হয়। যেমন : মত, জল, কল, মল, ঢল, চল, হল।
১৬. ‘বাক’ ও ‘বাগ’ যুক্ত শব্দের ‘ক’ সব সময় ‘ক্’ উচ্চারিত হয়। যেমন : বাকচাতুর্য, বাকপটু, বাকশক্তি, বাকসংযম, বাকশক্তি, বাকশুদ্ধি, দিকপতি, দিকপাল ইত্যাদি।
১৭. বাগ ও দিগ যুক্ত শব্দের ‘গ’ সব সময় ‘গ্’ উচ্চারিত হয়। যেমন: বাগদান, বাগধারা, বাগবিতণ্ডা, বাগবিধি, বাগবিন্যাস, বাগবৈদগ্ধ, বাগযুদ্ধ, দিগজ্ঞান, দিগদর্শন, দিগভ্রান্ত ইত্যাদি।
১৮. ই/ঈ/উ/ঊ-কারের আগের ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: কবি (কোবি), নদী (নোদি), মরু (মোরু), বধূ (বোধু), জননী (জনোনি), উপকূল (উপোকুল), অণু (ওনু), গরু (গোরু), কদু/কোদু, ছোট (ছোটো), প্রিয় (প্রিয়ো), যাবতীয় (যাবতিয়ো)।
১৯. তিন বর্ণবিশিষ্ট্য শব্দের মাঝের বর্ণ ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: কলম (কলোম), কলস, জীবন, মরণ, ধরন, গঠন, চরণ, স্মরণ।
২০. স্বরসঙ্গতির কারণে শব্দের মধ্যে ও শেষে ধ্বনিটির উচ্চারণ হবে ‘অ’ এর মতো। যেমন: কলম, যত, শ্রেয়।
২১. তম, তর, তন শব্দে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন : প্রিয়তম (প্রিয়তমো), গুরুতর (গুরুতরো,) বৃহত্তর (বৃহোৎতরো), সর্বোত্তম (শরবোৎতোমো) ইত্যাদি।
২২. সাধারণত ক্রিয়াপদে ‘ও’ বসে না। তবে পক্ষ ও অর্থ পরিষ্কার করতে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: পড়-পড়ো-পড়ান-পড়ানো, সে পড়ে (পোড়ে) চলে (চোলে) গেলো (গেলো)।
২৩. সাধুক্রিয়া থেকে চলিত ক্রিয়ারূপে ‘ও’ উচ্চারিত হয়। ছ, ল, ব, ত যুক্ত ক্রিয়াপদের ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: বলছ (বোলছো), বলল (বোললো), বলব (বোলবো), করত (কোরতো)।
২৪. সাধু ক্রিয়া থেকে চলিত ক্রিয়ায় রূপান্তরিত করতে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’-এর মতো উচ্চারিত হয়। যেমন : করিবার>করবার (কোরবার), ধরবার (ধোরবার), মরবার (মোরবার), চড়বার (চোড়বার) ইত্যাদি।
২৫. সমাপিকা ক্রিয়ায় ব্যবহৃত ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: সে কাজটি করে। করে সমাপিকা তাই ‘ও’ উচ্চারিত হবে না। সে কাজটি করে চলে যাবে। এখানে কোরে ও চোলে উচ্চারিত হবে।
২৬. দ্বন্দ্বযুক্ত বানানে অথবা আদেশ ও অনুরাধ জাতীয় ক্রিয়ায় ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চাতি হয়। যেমন: হল-হলো, এল-এলো, সব-সবো, বল-বলো, চল-চলো, মল-মলো, বসে-বোসে, বলে-বোলে, ফোঁটে-ফুটে, ওঠে-উঠে, হলে-হোলে, করে-কোরে, লব-লবো ইত্যাদি।
২৭. কিছু বিশেষ্য ও বিশেষণের পার্থক্য দূর করতে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: কাল-কালো, ভাল-ভালো, খাট-খাটো।
২৮. জ্ঞ (জ+ঞ) প্রথম থাকলে গ্যাঁ আর অন্য স্থলে থাকলে গঁগ, গঁগো উচ্চারিত হয়। যেমন: জ্ঞান (গ্যাঁন), অজ্ঞান (অগঁগান), অজ্ঞ (অগঁগো), জিজ্ঞাস (জিগঁগাস)।
২৯. পক্ষ ও কালের কারণে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: পড়-পড়ো, ধর-ধরো, বল-বলো, সাজ-সাজো, বাধ-বাধো, হার-হারো, মার-মারো, বক-বকো, কর-করো। অনুজ্ঞায় ‘অ’ ধ্বনি ‘ও’ উচ্চারিত না হয়ে প্রযোজক ক্রিয়ায় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন: লাগান-লাগানো, জাগান-জাগনো, ভুলান-ভুলানো ঢাল-ঢালো, উঠান-উঠানো, বসান-বসানো, করান-কারানো, তাড়ান-তাড়ানো, বলান-বলানো, শেখান-শেখানো, লেখান-লেখানো, চালান-চালানো ইত্যাদি।
৩০. ব্যঞ্জনে যুক্ত ‘ঔ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও+উ’ উচ্চারিত হয় এবং শেষে ‘অ’ ধ্বনি সব সময় ‘ও’ উচ্চারিত হয়। যেমন : গৌণ/গোউনো, মৌন/মোউনো, পৌর, যৌথ, ধৌত, ভৌম, সৌধ।
No comments:
Post a Comment